খুলনা | শুক্রবার | ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

খুলনা মহানগরীর সড়ক অবকাঠামোয় যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা : অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:২৭ এ.এম | ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


খুলনা নগরীর সড়ক অবকাঠামোয় যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা। প্রথমবারের মতো নগরীতে নির্মাণাধীন উড়ালসড়কসহ তিন লিংক রোড প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ৭১৫ কোটি টাকার এ প্রকল্পের একটি সড়কের অগ্রগতি এখন প্রায় ৭০ শতাংশ। নিরালা থেকে সিটি বাইপাসে সরাসরি সংযোগ স্থাপনই এ প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য।
প্রকল্পের আওতায় নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে সিটি বাইপাস পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, যার মাঝামাঝি অংশে থাকছে একটি দৃষ্টিনন্দন উড়ালসেতু। এই অংশের কাজ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে সড়কের বিভিন্ন অংশে ঢালাই, পিলার স্থাপন ও সংযোগ কাঠামোর কাজ দৃশ্যমান।
একই প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে রায়েরমহল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এই অংশের অগ্রগতি প্রায় ৪০ শতাংশ। এছাড়া বাস্তুহারা এলাকা থেকে পুরাতন সাতক্ষীরা সড়ক পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ তৃতীয় সড়কের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, তিনটি লিংক রোড চালু হলে নগরীর ভেতরে প্রবেশ ও বের হওয়ার বিকল্প পথ তৈরি হবে। বর্তমানে যেসব ভারী যানবাহন শহরের প্রধান সড়ক ব্যবহার করে যানজট বাড়ায়, তারা সরাসরি সিটি বাইপাস ব্যবহার করতে পারবে। এতে নগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কে চাপ কমবে এবং যাতায়াত সময়ও উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পাবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা বলছেন, নতুন সড়ক চালু হলে নিরালা, রায়েরমহল ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে আবাসন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়বে। ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় জমির দামও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
সাতক্ষীরা থেকে ট্রাকে মালামাল বহন করা চালক মনসুর হায়দার বলেন, প্রতিনিয়ত গল্লামারি দিয়ে শহরে প্রবেশ বা বের হতে হয়। তবে সড়কটি সব সময়ই যানজট লেগেই থাকে। নতুন এ সড়কটি অনেকটাই কাজ এগিয়েছে। নতুন এ সড়কটি চালু হলে গল্লামারি সড়কের উপর চাপ অর্ধেকটা কমে আসবে। আমরা আরও দ্রুত শহর থেকে বের হওয়া বা প্রবেশ করতে পারবো। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।
নিরালা এলাকার ব্যাংক কর্মকর্তা সৌরভ মজুমদার বলেন, মোটরসাইকেলে করে প্রতিদিন আমাকে বাগেরহাটের ফকিরহাটে চাকরির জন্য যেতে হয়। গল্লামারি দিয়ে যাতায়াত করতে গেলে পথেই আমার এক ঘন্টা সময় নষ্ট হয়। সড়কটি এখনও পূর্ণাঙ্গ হয়নি, তবে আমি এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত শুরু করেছি। এ সড়কটি চালু হলে, আমার মতো অনেকেই এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। তাতে আমাদের কর্মঘন্টা বেঁচে যাবে। এ সড়ক নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। 
নিরালা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আবাসিক এলাকার মধ্যে এমন বড় সড়ক হলে তা আবাসিক এলাকার চরিত্রই নষ্ট করে দেবে। এখন আমাদের বাড়িঘর অনেকটা নিচু হয়ে পড়েছে। সড়কের মধ্যে এতবড় সেতুর কোনো প্রয়োজন ছিল না। এছাড়া সড়কের দুই প্রান্ত প্রশস্ত না করলে নতুন করে যানজট  তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।’
প্রকল্পের নকশা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, উড়ালসড়কের নিচ দিয়ে যান চলাচলের সুযোগ রাখা হয়নি, যা ভবিষ্যতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নিরালা মোড়ের বর্তমান অবকাঠামো অপর্যাপ্ত বলে দাবি তাদের। 
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের খুলনা চ্যাপ্টারের সেক্রেটোরি আসিফ আহমেদ বলেন, নিরালা মোড় প্রশস্ত না করলে এবং আংশিক পুনঃনকশা না করা হলে নতুন সড়ক চালু হওয়ার পরও সেখানে যানজট তৈরি হতে পারে। বড় প্রকল্পে ছোট নকশাগত সীমাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এ সড়কটির পুনঃনকশা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় ট্রাফিক ফ্লো, ভবিষ্যৎ যানবাহনের চাপ এবং নগর স¤প্রসারণ সব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, থ্রি-লিংক রোড প্রকল্পের পরিচালক মোরতুজা আল মামুন জানান, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পেছালেও নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই অন্তত নিরালা অংশের কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। কাজের গতি বাড়াতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 
প্রকল্পের ব্যয় ৭১৫ কোটি টাকা হলেও সময় বৃদ্ধি ও নকশা সংশোধনের কারণে ভবিষ্যতে ব্যয় বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, খুলনার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করেছে উড়ালসড়কসহ তিন লিংক রোড প্রকল্প। এখন দেখার বিষয় নকশাগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সময়মতো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায় কি না, আর খুলনাবাসী আদৌ কতটা সুফল পান এই বহুল আলোচিত অবকাঠামো উদ্যোগ থেকে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ